২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬ , ৯ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দাবি

শ্রমিক আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে যাবার পথে

অনলাইন প্রতিবেদক
আপলোড সময় : ০৮-০২-২০২৬
শ্রমিক আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দর অচল হয়ে যাবার পথে
সঙ্কট ক্রমশ জটিল আকার ধারন করতে যাচ্ছে। সামনেই রোজা। এমন এক মুহুর্তে চট্টগ্রাম বন্দর আজ রোববার থেকে আবারও অচল করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শ্রমিকেরা। কর্মবিরতি দুদিন স্থগিত রাখার পর আজ থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিষদ এ ঘোষণা দেয়। এত দিন আন্দোলনে বন্দরের বহির্নোঙরের কাজ চললেও এবার সেই কাজও বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা সংকট নিরসনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। গতকাল প্রধান উপদেষ্টার কাছে একটি চিঠি দিয়েছেন তাঁরা।

এ ছাড়া বন্দরের অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরুর আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ‍্যাম বাংলাদেশ)।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আজ সকালে নেতৃস্থানীয় ২০০ শ্রমিককে বৈঠকে ডেকেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে ওই বৈঠকে শ্রমিকেরা যাবেন কি না, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

রমজান মাস ও সংসদ নির্বাচনের আগে এই ধরনের পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন সংশ্লিষ্ট সবাই। বন্দরে জাহাজজট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ৬ হাজার রপ্তানি কনটেইনার আটকে রয়েছে। এর মধ্যে বহির্নোঙরেও কাজ বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। 

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দাবিতে আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল হয়ে পড়তে যাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম। পবিত্র রমজান মাস ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বন্দরের এই অচলাবস্থা দেশের অর্থনীতিকে এক মহাসংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে  করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
 
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মবিরতি ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে রূপ নেয়। এই ধর্মঘট গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার আশ্বাসে স্থগিত করেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৫ শ্রমিক নেতার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তে দুদককে চিঠি দেওয়া হয়।
 
এতে সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন আন্দোলনকারীরা।
 
শ্রমিক-কর্মচারীদের হয়রানির অভিযোগ তুলে আজ রবিবার আবারও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দর অচলের ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গতকাল শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের এস রহমান মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর ও মো. ইব্রাহিম খোকন।
ফলে কর্মবিরতি স্থগিতের মাত্র দুই দিন পরই আবারও চরম অচলাবস্থার শঙ্কায় পড়েছে বন্দর। আন্দোলনরত ১৫ শ্রমিককে শাস্তিমূলকভাবে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হলেও তাঁরা কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে আন্দোলনে অনড় রয়েছেন।
 
গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মবিরতিতে থমকে যায় বন্দর। কর্ম বিরতির জেরে বন্দর ও ১৯টি বেসরকারি ডিপো মিলিয়ে প্রায় ৫১ হাজার থেকে ৫৪ হাজার টিইইউস (২০ ফুট লম্বার কনটেইনারের একক) কনটেইনার আটকা রয়েছে।
জেটিতে থাকা জাহাজগুলো থেকে পণ্য খালাস শুরু হলেও আবারও বন্ধ হয়ে যাবে। বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজ ১০০ থাকলেও সেটি আরো বাড়বে বলে শঙ্কা রয়েছে।
 
চট্টগ্রাম বন্দরে আবার অচল অবস্থা সৃষ্টি হলে তা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ বাড়াবে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বন্দরে প্রায় ১০০ জাহাজে ভোগ্যপণ্য আটকা পড়ে আছে। বন্দরে কাজ বন্ধ থাকলে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করা যাবে না।
তাতে বাজারে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়বে, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, রমজান শুরুর আগে ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের চাহিদা থাকে তুঙ্গে। এখন বন্দর বন্ধ থাকলে এসব ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়বে। পাইকারি বাজারে ভোগ্যপণ্যের সংকট দেখা দেবে।
 
বিজিএমইএ নেতারা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো জাহাজীকরণ না হলে বিদেশি ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন। ব্যবসায়ীদের বিশাল অঙ্কের ডেমারেজ চার্জ গুনতে হবে। প্রতিটি বিদেশি জাহাজকে অলস বসে থাকার জন্য দৈনিক ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার জরিমানা দিতে হয়। কারণ দেশের ৯৬ শতাংশ কনটেইনারবাহী পণ্য হ্যান্ডলিং হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। আন্দোলনে তৈরি পোশাক খাতের বিশাল ক্ষতি হচ্ছে জানিয়ে এশিয়ান গ্রুপের মালিক এম এ সালাম জানান, চলতি সপ্তাহেই তাঁদের ৬০ কোটি টাকার পোশাক জাহাজীকরণ সম্ভব হয়নি।
 
বেসরকারি ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সদস্যসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ডিপোগুলোয় বন্দরে জাহাজীকরণের অপেক্ষায় ১০ হাজার ৮১৭ টিইইউস কনটেইনার পড়ে আছে। খালি কনটেইনার রয়েছে ৫২ হাজার টিইইউস। রপ্তানিমুখী কনটেইনার রয়েছে সাত হাজার ৯১৭ টিইইউস। এসব কনটেইনার ডেলিভারি হচ্ছে, কিন্তু রপ্তানি এবং খালি কনটেইনার বন্দরে যাচ্ছে কম। আবার বন্দর থেকে আমদানি কনটেইনারও আসছে কম।
 
শ্রমিক নেতারা আন্দোলনকে ‘বন্দর রক্ষার লড়াই’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে : বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত ও অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ লাভজনক এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা, বন্দর চেয়ারম্যানের অপসারণ ও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির তদন্ত করা, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের বদলি, বরখাস্ত ও অভিযোগপত্র প্রত্যাহার করা,  শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা বা আইনি পদক্ষেপ বন্ধ করা। এসব দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিক কর্মচারীদের কর্মবিরতি চলবে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের (সাবেক বন্দর-সিবিএ নেতা) মো. হুমায়ুন কবির।
 
চট্টগ্রাম শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের (স্কপ) কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, বন্দরের এই অবস্থার মধ্যেও ঢাকায় এনসিটি চুক্তি স্বাক্ষরের তোড়জোড় অব্যাহত রেখেছে সরকার। এসব থেকে সরে আসতে হবে। না হলে আন্দোলন চলবে। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘পুরো আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয় দেখছে।’
 
এদিকে গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম) এই অচলাবস্থায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে বন্দরে আটকা থাকা রপ্তানি পণ্যের মূল্য প্রায় ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা)। তা সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে ইউরোপীয় ক্রেতারা ক্রয়াদেশ বাতিল করতে পারেন, যা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলবে।
 


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ